মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

রংপুর সদর উপজেলার পটভূমি

রংপুর বা রঙ্গঁপুর নামকরণের ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা বহুসংখ্যক হলেও মোগল অধিকৃতের পূর্বে এই অঞ্চলের নামকরণে রংপুর বা রঙ্গঁপুর শব্দটি পাওয়া যায়না। রংপুর বা রঙ্গঁপুর নামকরণের ঐতিহাসিক ব্যাখ্যাগুলোর মধ্যে কয়েকটি উল্লেখ করা যেতে পারে।

       রঙ্গঁ শব্দটি ফার্সী শব্দ। এর অর্থ প্রমোদ, রসিকতা, নাট্যকর্ম (রঙ্গঁশালা)। প্রায় তিন হাজার বছর পূর্বে প্রাগজ্যোতিষপুর রাজাদের আমলে এ অঞ্চলে নট-নটি ও বারবনিতারা রঙ্গাঁলয়ের সাথে জড়িত ছিল। পরবর্তিতে মধ্যযুগ এবং ইংরেজ আমলেও বরেন্দ্র অঞ্চলের সামমত্ম রাজা জমিদারদের প্রমোদখানা ও ভোগ বিলাসের চিহ্ন পাওয়া যায়। বৃটিশ আমলে এডওয়ার্ড মেমোরিয়াল হল যা আজকের পাবলিক লাইব্রেরী ভবন তার উদাহরণ। এধরনের রঙ্গঁবসিকতার আধিক্যহেতু এতদঞ্চলের নাম রঙ্গঁপুর এবং ভাষামত্মরে রংপুর হয়েছে। 

      ‘রঙ্গঁ’ শব্দটির অন্য একটি অর্থ যুদ্ধ। প্রত্মতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা যায় মধ্যযুগের রংপুর অঞ্চলে অসংখ্য যুদ্ধ-বিগ্রহ সংঘঠিত হয়েছে। তৎকালীন রাজধানী ঘোড়াঘাটকেন্দ্রিক যুদ্ধ ব্যতিত ১৬৮৭ সাল হতে ১৭১১ সাল পর্যমত্ম এই ভূ-খন্ডে অসংখ্য যুদ্ধ ঘটে গেছে। এজন্যই এ অঞ্চলের নাম হয়েছে জঙ্গঁপুর বা রঙ্গঁপুর।

    ‘বাঙালির ইতিহাস’ গ্রন্থে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ড. নীহার রঞ্জন রায় রঙ্গঁপুর নামকরণে লাল মাটি অধ্যুষিত বৌদ্ধ প্রভাবিত রংপুরের কথা বলেছেন। রংপুর অঞ্চলে লাল মাটি বা খিয়ারমাটির এলাকা অত্যন্ত সীমিত। সুতরাং লাল-মাটির আধিক্য অধ্যুষিত রংপুরের সংগে এ অঞ্চলের সাযুজ্য অত্যন্ত সীমিত।

      রংপুর জেলার অধিকাংশ অঞ্চলে তিসত্মা নদীর পুরাতন পস্নাবন ভূমি রয়েছে। এই তিসত্মা নদীর মধ্যযুগে দিসত্মাং নামে পরিচিত ছিল। দিস্তাং অঞ্চলে প্রায় দুই-তিন হাজার বছর আগে বিশেষ একটি ভাষাগোষ্ঠীর ভাষা ‘রং’ ভাষা। অন্যদিক তিসত্মা বা দিসত্মাং নদীর আদিনাম রংপো বা রংপু। তাই রংপু বা তিসত্মার অববাহিকায় অবস্থিত বলে এর নাম রংপুর হতে পারে।

            William Hunter এর Statistical Accounts of Rangpur District হতে জানা যায় ১৬৬০-৬১ সালে মোগল অধিকৃতের পর রংপুর অঞ্চলের নামকরণ হয় ‘ফকির কুন্ডি’। অর্থাৎ মোগল অধিকৃতের পরে রংপুর নামকরণ হয়। সুতরাং রঙ্গঁপুর বা রংপুর নামকরণের ঐতিহাসিক উৎপত্তি মধ্যযুগ। আর রংপুরের মধ্যযুগের ইতিহাস নানা যুদ্ধ-বিগ্রহে সমাচ্ছন্ন। অন্যদিকে প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় সামমত্ম সমাজে বাংলার প্রতিটি অঞ্চলেই রঙ্গঁশালা, প্রমোদ উদ্যান ছিল। শুধু রংপুরেই রঙ্গঁরসের আধিক্য হেতু নামকরণে প্রভাব ফেলেছে এমন ভাবনা অনেকেই সমর্থন করেননি। তাই রঙ্গঁপুর নামকরণে মধ্যযুগীয় যুদ্ধ-বিগ্রহের প্রভাব অপেক্ষাকৃত বেশী যৌক্তিক বলে আমরা মনে করতে পারি।

নগরায়ন

            চতুর্দশ শতকের শুরম্নতে কামরূপ রাজ্য ভেঙ্গে কামতা রাজ্য তৈরী হয়। কামতারাজ্যের আরেকটি নাম কামতা বিহার। বর্তমান রংপুরের নয় কি.মি. পশ্চিমে মন্থনা মৌজায় কামতা রাজ্যের একটি প্রতিরোধ দুর্গের ধ্বংসাবশেষ আছে।

            বর্তমান রংপুর শহর হতে পূর্ব দিকে তামপাট ইউনিয়ন পরিষদের এলাকাটি মীরগঞ্জ নামে পরিচিত। মীরগঞ্জ হলো মধ্যযুগ ও সুলতানী আমলের রঙ্গঁপুরের আদি নগরায়ন। এলাকাটি এখনও বড় রংপুর মৌজা নামে এবং বাজারটি নগর মীরগঞ্জ নামে পরিচিত। মোগল আমলে রঙ্গঁপুর শহর মীরগঞ্জ হতে উত্তরে মাহীগঞ্জ বাজার ভিত্তিক নগরীরূপে গড়ে ওঠে। মাহীগঞ্জের পূর্বাঞ্চল এখনও ছোট রংপুর নামে পরিচিতি।

রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রাম ও রংপুরঃ

            রংপুরের রাজনৈতিক ইতিহাস অত্যমত্ম সমৃদ্ধ। পলাশীর যুদ্ধের পর ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসনামলে বাংলার অন্যান্য অঞ্চলের ন্যায় রংপুর অঞ্চলেও সমাজ কাঠামো ভেঙ্গে পড়ে। মোগল আমলের স্থিতিশীল সামন্তবাদী সমাজের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ আরও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর। এ সময় ইংরেজদের অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে রংপুরে প্রথম প্রজা বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন মন্থনার জমিদার জয়দুর্গা দেবী চৌধুরানী, ইটাকুমারীর জমিদার শিবচন্দ্র রায়, ভবানী পাঠক, দিরাজী নারায়ন কৃপানাথ, ইসরাইল খাঁ, মুসা শাহ, নুরুল দীন ওরফে নুরুল উদ্দিন, দয়াল শাহ, কেনা সরকার। ইংরেজ ইজারাদার দেবী সিংহের অত্যাচারের বিরুদ্ধে নুরুল উদ্দিন বিদ্রোহ ঘোষণা করলে অনেকেই তাকে সাহায্য করেন।

            ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহে রংপুর শহরের ষ্টেশন রোড, সালেক পেট্রল পাম্পের পাশে শহীদ হন মোহাম্মদ ওয়ালীদাদ খান। তিনি মোগল সম্রাটদের বংশধর ছিলেন। সালেক পেট্রল পাম্পের পাশে তার সমাধি আছে। রংপুরে স্বদেশী আন্দোলনের অন্যতম সংগঠন অনুশীলন সমিতির প্রধান রাজনৈতিক নেতা ছিলেন সতীশ পাকরাশী। রংপুরে খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনে যাঁরা নেতৃত্ব দান করেন তাদের মধ্যে জীতেন চক্রবর্তী, মাওলানা এহসানুল হক আফেদ্দী, কুড়িগ্রামের কাজী এমদাদুল হক, বদরগঞ্জের দারাজ উদ্দিন মন্ডল, মাহতাব উদ্দিন খান, হীরেন্দ্র নাথ মুখার্জী, জমিদার বিজয় বাবু, দীনেশ লাহিড়ী, বিমল ভৌমিক, নৃপেন ঘোষ, বেনী মাধব উকিল, দৌলতুন্নেছা, প্রতিভা সরকার প্রমূখ অন্যতম।

            ১৯৩৬-১৯৩৭ সাল হতে পরবর্তী সময় পর্যন্ত মুসলিম লীগের নেতৃত্বে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে ইমাদ উদ্দিন, রফায়েত উল্লাহ সরকার, শাহ আব্দুল হামিদ, আহমদ হোসেন, খয়রাত হোসেন, এম.এ আউয়াল, দবির উদ্দিন আহমেদ, আবুল হোসেন, মশিউর রহমান যাদু মিয়া, কাজী আব্দুল কাদের, কুড়িগ্রামের এম.এ হাফিজ প্রমূখ উল্লেখযোগ্য।

            ১৯৫২ সনের ভাষা আন্দোলনে রংপুরের নেতৃত্বে ছিলেন পীরগঞ্জের মতিউর রহমান, অধ্যাপক নুরুল ইসলাম, আব্দুল গনি এডভোকেট, আব্দুস সোবহান, খন্দকার আজিজার রহমান, মোতাহার হোসেন সুফি, শাহ আব্দুর রাজ্জাক, মোঃ আফজাল, এডভোকেট সিদ্দিক হোসেন, শাহ তোফাজ্জল হোসেন, আবেদ আলী, মিলি ভট্টাচার্য প্রমূখ।

            পাকিস্তান আমলের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে রংপুরের আপামর জন সাধারণের যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের মধ্যে মনিকৃষ্ণ সেন, আমজাদ হোসেন, জীতেন দত্ত, মাহফুজ আলী জররেজ, পাখি মৈত্র, ভিকু চৌধুরী, এডভোকেট কাজী এহিয়া, এডভোকেট মোঃ আফজাল, গোলাম মোস্তফা বাটুল, হারেছ উদ্দিন সরকার, রফিকুল ইসলাম গোলাপ, হারেছ উদ্দিন সরকার, মমতাজ জাকির আহমেদ সাবু, অলক সরকার, ইলিয়াস আহমেদ, আবুল মনসুর আহমেদ, শহীদ মুখতার এলাহী, মাহবুবুল বারী, নুরুল হাসান, মুকুল মোস্তাফিজুর রহমান প্রমূখ।

            মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভে ৩রা মার্চ রংপুরে আলমনগর ষ্টেশন রোডে মিছিল চলাকালে অবাঙালী সরফরাজ খানের বাড়ী হতে গুলি বর্ষিত হলে কিশোর শংকু সমজদার নিহত হন। নিহত শংকু সমজদারের বাড়ি গুপ্ত পাড়ায় এবং তিনিই রংপুরের মুক্তিযুদ্ধে প্রথম শহীদ। ২৩ শে মার্চ রফিকুল ইসলাম গোলাপের নেতৃত্বে রংপুরে স্বাধীন বাংলার জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। ২৮ শে মার্চ ১৯৭১ সালে রংপুরের আপামর জনতা তীর ধনুক নিয়ে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করে। সেদিনের ক্যান্টমেন্ট ঘেরাও আন্দোলনে প্রায় ৫০০ এর অধিক লোক মৃত্যুবরণ করেন। মুক্তিযুদ্ধকালে সাংস্কৃতিক দলের সদস্য হিসেবে যারা অংশগ্রহন করেন তাদের মধ্যে সিরাজ উদ্দিন, বলাই পাল, চায়না নিয়োগী, কবিতা দাস, কছিমুদ্দিন, ফজিলাতুনন্নেছা (বুলু আপা), অরুন মুখার্জী, মুকুল মোস্তাফিজুর রহমান, রামকৃষ্ণ সোমানী, শামসুন্নাহার রেনু, রনী রহমান (শহীদ), আহমেদ নুর টিপু, খাদিমুল ইসলাম বসুনিয়া প্রমূখ অন্যতম। রংপুরের বধ্যভূমিগুলোর মধ্যে দমদমা ব্রিজ বধ্যভূমি, নিসবেতগঞ্জ বধ্যভূমি, দখিগঞ্জ শ্বশ্মান বধ্যভূমি, নব্দীগঞ্জ বধ্যভূমি, টাউন হলের গ্রীন রুম ও পার্শ্ববর্তী কুয়া, জাফরগঞ্জ বধ্যভূমি অন্যতম।

            মুক্তিযুদ্ধকালীন রংপুরে শহীদ হন এমন কয়েকজন হলেন- মাহফুজ আলী জররেজ, কারমাইকেল কলেজের অধ্যাপক কাঁলাচাদ রায়, অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন রায়, অধ্যাপক সুনীল বরন চক্রবর্তী, অধ্যাপক সোলায়মান আলী, অধ্যাপক রামকৃষ্ণ অধিকারী, অধ্যাপক আব্দুর রহমান, পূর্ণচন্দ্র সরকার, মাজাহার হোসেন, ভিকু চৌধুরী, মিলি চৌধুরী, শংকর লাল বনিক, মোবারক হোসেন, রনি রহমান, শহীদ মুখতার এলাহী, ওমর আলী, গোলাম গৌওছ, শিবেন মুখার্জী প্রমূখ।

ছবি


সংযুক্তি

rangpur history unicode_0.doc rangpur history unicode_0.doc